| বঙ্গাব্দ

ট্রাম্পের ইরান চুক্তি কেন মানতে চান না নেতানিয়াহু: বিশেষ বিশ্লেষণ | বাংলাদেশ প্রতিদিন

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 08-06-2026 ইং
  • 5335 বার পঠিত
ট্রাম্পের ইরান চুক্তি কেন মানতে চান না নেতানিয়াহু: বিশেষ বিশ্লেষণ | বাংলাদেশ প্রতিদিন
ছবির ক্যাপশন: ট্রাম্পের ইরান চুক্তি কেন মানতে চান না নেতানিয়াহু

কেন ট্রাম্পের ‘ইরান চুক্তি’ মেনে নিতে নারাজ নেতানিয়াহু: আলোড়ন সৃষ্টি করা এক চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ০৮ জুন, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার আলোচনা নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এমন কোনো সমঝোতা বা চুক্তি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক সামি আল-আরিয়ান।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আই-এ প্রকাশিত এক বিশেষ নিবন্ধে তিনি দাবি করেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি এমনভাবে তৈরি যে, ইরানকে আঞ্চলিকভাবে সম্পূর্ণ দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় না করা পর্যন্ত তিনি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো স্থায়ী সমাধানকে সফল বলে মনে করেন না।

নেতানিয়াহুর একক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা

সামি আল-আরিয়ানের নিখুঁত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরান এবং দেশটির সমর্থিত মিত্রগোষ্ঠীগুলো। ফলে গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ কিংবা অঞ্চলের অন্যান্য ইরানপন্থী শক্তিকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে না দিয়ে যুদ্ধের অবসান ঘটানো ইসরাইলের জন্য আত্মঘাতী হবে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী মূলত এমন একটি নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা দেখতে চান, যেখানে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল হবে একমাত্র প্রধান প্রভাবশালী সামরিক শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র হবে তার অন্ধ কৌশলগত নিরাপত্তা অংশীদার।

নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং ইরানকে ঘিরে যে অস্থিরতা চলছে, সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো মূলত বৃহত্তর আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রভাব বিস্তারের লড়াই। দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও ইসরাইল তার কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। তবে নেতানিয়াহু এটিকে নিজের কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে, বরং আরও কঠোর ও বিধ্বংসী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে বিবেচনা করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ট্রাম্পের সংকট

অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা আগের তুলনায় অনেক ভিন্ন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে খোদ আমেরিকার ভেতরের জনগণই দীর্ঘস্থায়ী কোনো বিদেশি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার তীব্র বিরোধিতা করছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে জনসমর্থন আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের সাধারণ ভোটাররাই এখন বিদেশে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালানোর ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়েছেন।

বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার এখন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন যে—কেন মার্কিন জনগণকে অন্য দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিক মূল্য দিতে হবে? তাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে সাধারণ আমেরিকানরাও একমত হচ্ছেন। তারা মনে করছেন, এই বিদেশি সংঘাতের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পায়, অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হচ্ছে।

এর পাশাপাশি আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় মাথা ব্যথার কারণ। বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে কোনো নতুন বৃহৎ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পড়বে। ফলে কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়ে ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতি ও মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই সংঘাতের প্রভাব বেশ সংবেদনশীল। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। যেহেতু বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, তাই সেখানে সামান্য অস্থিতিশীলতা তৈরি হলেও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ধস নামতে পারে, যা আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলবে।

একই সাথে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ও তার মিত্রদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় দামি সামরিক সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আর এই বাস্তবতাই ওয়াশিংটনকে বুঝতে বাধ্য করছে যে, শুধুমাত্র সামরিক শক্তির মাধ্যমে সব রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজাই বুদ্ধিমানের কাজ।

সমঝোতার টেবিলে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব!

সামি আল-আরিয়ানের মতে, ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা এবং তাদের আঞ্চলিক প্রভাব মুছে ফেলার যে যৌথ লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ছিল, তা পুরোপুরি সফল হয়নি। আবার ইরানও অঞ্চল থেকে মার্কিন প্রভাব সম্পূর্ণ দূর করতে পারেনি। ফলে উভয় পক্ষ এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছে, যেখানে কেউই নিজেদের পূর্ণ বিজয় নিশ্চিত করতে পারছে না।

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা এবং নিজস্ব নীতিগত স্বাধীনতা বজায় রাখাই তেহরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সাফল্য। আর এই কারণেই যেকোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি—যা ইরানকে ধ্বংস না করে অক্ষত অবস্থায় বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবে, তা নেতানিয়াহুর কাছে চরম অস্বস্তিকর।

কূটনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে, পাকিস্তানসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের মধ্যস্থতায় একটি সম্ভাব্য সমঝোতা কাঠামো নিয়ে পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে। এই প্রস্তাবিত আলোচনায়—

  • অন্তত ৬০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি,

  • হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা,

  • ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আংশিকভাবে শিথিল করা এবং

  • ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি আপাতত ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য তুলে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

মহাপ্রলয় নাকি শান্তির পথ?

সবশেষে বিশ্লেষক মন্তব্য করেন যে, মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক সমাধানের উজ্জ্বল সম্ভাবনা, অন্যদিকে রয়েছে আরও বিস্তৃত ও বিধ্বংসী আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভয়াবহ ঝুঁকি। দীর্ঘমেয়াদে শুধুমাত্র সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে কোনো রাষ্ট্রই আঞ্চলিক আধিপত্য ধরে রাখতে পারে নেই। তাই সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার পথ বেছে নেওয়া হলে তা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। অন্যথায়, উত্তেজনা আরও বাড়লে মধ্যপ্রাচ্য এক নতুন ও দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়বে।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency